Wednesday, 17 June 2015






বেশ চমৎকার বিজ্ঞাপন। আমজাদ হোসেনের অভিনয় সুন্দর হয়েছে। অনেকদিন পর মা চরিত্রে অপু সরকারকে দেখে বেশ ভাল লাগল। আর মেয়েটিতো সেই প্রথম থেকেই রবির বিজ্ঞাপনে লেটার মার্ক পেয়ে আসছে।

রমজান সংযম এর মাস হলেও ঈদ উপলক্ষে এই মাসে ঘুষ খাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। সেই রমজানকে সামনে রেখেই রবি দারুণ এই বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করেছে। জ্বলে উঠুন আপন শক্তিকে চেঞ্জ করে তারা লিখেছে জ্বলে উঠুন সততার শক্তিতে।

এভাবে সততাকে ধরে রাখতে পারলে দেশটার চেহারায় পাল্টে যেত। কিন্তু দুখের বিষয় ওর আছে আমার কেন নাই? এই নাই থেকে, লোভ থেকে আমরা দুর্ণীতিতে জড়িয়ে পরি। ঘুষ খাওয়া আমাদের সমাজে এতটাই সহনীয় হয়ে গেছে যে আমরা বিয়ের বাজারে পাত্র খুঁজতে গিয়ে বেশ প্রশংসা সহকারে বলি ছেলের ভাল উপড়ি ইনকাম রয়েছে! ঘুষ খেয়ে বিশাল অট্টালিকা তৈরি আর শেষ বয়সে গিয়ে ঘুষের টাকায় হজ্ব করে সকল ঘুষকে হালালে পরিণত করার বৃথা চেষ্টা করি।

এখানে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া অপরাধ, ভালবাসা প্রকাশ করা অপরাধ কিন্তু ঘুষ খাওয়া নয়। আমাদের আশেপাশের অধিকাংশ মানুষই ঘুষ খায়। আমি খায়, তুমি খায়, সে খায়। ঘুষ খাওয়াটাই স্মার্টনেস। এই স্মার্টনেসের যুগেও এখনও দু একজন মানুষ বাসের হ্যান্ডেল ঝুলতে ঝুলতে অফিসে যায়। মাছের বাজারে ঢুকে একটি চক্কর দিয়ে শেষে হাফ কেজি পটল, হাফ কেজি করলা কিনে নিয়ে বাসায় ঢুকে।

আমি অনেক মানুষ দেখেছি যারা সৎ থাকতে চায়, কিন্তু পরিবারের চাওয়া পাওয়ার কাছে হার মানে। তারাও এক সময় স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়।

যারা ঘুষ খায় তাদের জন্য না, বরং যে সকল সন্তান ঘুষের টাকায় আনন্দ ফুর্তি করে তাদের হৃদয়ে যদি বিজ্ঞাপনটি ধাক্কা দেয় তখনই বিজ্ঞাপন সার্থক হবে।

আজ আপনি যে আইফোন ব্যবহার করছেন, গাড়িতে ঘুরছেন, হাজার হাজার টাকার ড্রেস পড়ছেন, লোক দেখানো সামাজিকতা পালন করছেন সেগুলো করার আগে কখনও কি ভেবে দেখেছেন? এই টাকা কোথা থেকে আসে? আপনার বাবার বেতন স্কেল কত আর আপনার পরিবারের খরচ কত?

সততার উদাহরণ শুরু হোক পরিবার থেকেই। নিজে অসৎ পয়সার ইনকাম ব্যবহার করা বন্ধ করুন দেখবেন দেশ আপনিই বদলে যাবে।

সুন্দর এই বিজ্ঞাপনটির জন্য বিজ্ঞাপনের পেছনের মানুষদের ধন্যবাদ।
দেশ বিদেশের বিজ্ঞাপণ

Friday, 12 June 2015

বস্তুর মাত্রাসমূহ (Dimension)

নিচে যে ব্যাপারগুলো বর্ণিত হবে সেগুলো বোঝার জন্য কোনো বিষয়ে কোনো জ্ঞান না থাকলেও চলবে। শুধু দুটো জিনিস থাকতে হবে – ইমজিনেশন এবং এক্সেপ্টেন্স। আগে ইমাজিনেশনের ছবি এঁকে পরে সেটাকে লজিক দিয়ে ফিল্টার করতে হবে। আগেই লজিকের ফ্রেমে আটকে দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবেনা। এ বিষয়ে আইনস্টাইনের একটা বিখ্যাত উক্তি দেয়া যায় – “The true sign of intelligence is not knowledge but imagination”।

ডাইমেনশনের ব্যাপারটা আমাদের কাছে সবসময়ই একটু অস্পষ্ট। আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা কোন ডাইমেনশনে কী হয়। এখানে সহজ ভাষায় সেটা বোঝানোর চেষ্টা করবো।


শুধুমাত্র একটা ডট, যার কোনো দৈর্ঘ্য নেই, প্রস্থ নেই।


সেই অসংখ্য ডট পাশাপাশি রেখে একটি লাইন নেয়া হলে সেটিই আমাদের ফার্স্ট ডাইমেনশন। অর্থাৎ একটা একক, আলাদা লাইন হবে ফার্স্ট ডাইমেনশন।


এখন যদি একাধিক লাইনকে পাশাপাশি রেখে একটা স্ট্রাকচার নেয়া হয়, তাহলে সেটা হবে তল (plane)। মানুষের চোখ এই ‘তল’ই দেখতে পারে এবং তলের উপর দিয়ে ট্রাভেল করে।

 যদি একাধিক তলকে একটার ওপর একটা রেখে কোনো স্ট্রাকচার বানানো হয়, আমরা পাবো স্পেস। এটা হলো থার্ড ডাইমেনশন। উল্লেখ্য যে মানুষ অবস্থান করে এই থার্ড ডাইমেনশনে। কিন্তু থার্ড ডাইমেনশনে অবস্থান করলেও আমাদের চোখ দেখতে পারে শুধু মাত্র সেকেন্ড ডাইমেনশনের স্ট্রাকচার। থার্ড ডাইমেনশনের মধ্য দিয়ে দেখা সম্ভব হলে মানুষ দেয়ালের মধ্য দিয়ে দেখতে পেতো এবং দেয়াল ভেদ করে চলে যেতে পারতো।
[ফ্যাক্টসঃ কেউ যদি N-th ডাইমেনশনে থাকে, তার সব কার্যকলাপের পরিধি থাকবে (N-1)th ডাইমেনশনে। কিন্তু তার কার্যকলাপের প্রভাব পড়বে N-th ডাইমেনশনেই। যেমন, আমরা থাকি থার্ড ডাইমেনশনে কিন্তু দেখি সেকেন্ড ডাইমেনশন। আবার তলের উপর দিয়ে গমন করি। কিন্তু আমরা চাইলেও বস্তুর মধ্যে দিয়ে গমন করতে পারবো না]
ফোর্থ ডাইমেনশনের ফ্যাক্টস ভালো করে পড়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।


ফোর্থ ডাইমেনশনের ক্ষেত্রে নতুন করে স্ট্রাকচার যোগ করলে ব্যাপারটার কোনো মানে থাকে না। সেক্ষেত্রে স্ট্রাকচারের বদলে যোগ করা হবে সময় (মহাবিশ্বের অতি ক্ষুদ্র কোন মুহুর্ত)। অর্থাৎ যে ফোর্থ ডাইমেনশনের মধ্যে অবস্থান করবে, সে যেকোনো বস্তুর ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারবে এবং যেকোনো বস্তুর মধ্য দিয়ে দেখতে পারবে। ফোর্থ ডাইমেনশন হলো মহাবিশ্বের এই মুহূর্তের বর্তমান অবস্থা। সোজা কথায় “বর্তমান” বা “present state” হল ফোর্থ ডাইমেনশন। কারণ, আমাদের অনুভূত মহাবিশ্ব স্পেস এন্ড টাইমের এক সম্মিলিত অবস্থা। তাই আমাদের ইউনিভার্স ফোর্থ ডাইমেনশনাল। এখানে ফোর্থ ডাইমেনশন দেখার প্রশ্নটা আমাদের জন্য অপ্রাসঙ্গিক। কেউ যদি কখনো সবুজ রঙ দেখে না থাকে তাহলে সে কিভাবে আইডিয়া করবে যে সবুজ রঙ কেমন? তারপরো যদি কেউ প্রশ্ন করে, “ফোর্থ ডাইমেনশনে কী দেখা যায়?”, সেক্ষেত্রে বেসিক আইডিয়া হলো, অসংখ্য তল পাশাপাশি ও ওপর-নীচে যোগ করার পরও ফোর্থ ডাইমেনশনে সবগুলো object এর ভিতরের গঠনও আমরা দেখতে পাবো।
[ফ্যাক্টসঃ যে যেই ডাইমেনশনে অবস্থান করে সে তার চেয়ে এক ডাইমেনশন নীচে চলাচল করতে পারবে এবং দেখতে পারবে। সেক্ষেত্রে যে ফোর্থ ডাইমেনশনে থাকবে সে সরাসরি বস্তুর মধ্য দিয়ে চলতে পারবে অর্থাৎ সে হবে স্থান জয়ী। যেকোন স্থানে যেকোন মুহুর্তে সে যেতে পারবে। সুতরাং ইন্টারস্টেলার তো বটেই, ইন্টারগ্যালাক্টিক ট্রাভেল এর জন্যও আপাতভাবে ফোর্থ ডাইমেনশনের বিকল্প নেই। কারণ স্পেসের উপর জয় না করে আলোর গতিতেও এই ট্রাভেলগুলোতে এক মানব জীবন অতিবাহিত হয়ে যাবে]


এখন আসি ফিফথ ডাইমেনশনে। এই ব্যাপারটা আসলে মানুষের সীমা বা সেন্সের বাইরে। এই ডাইমেনশন হলো ফোর্থ ডাইমেনশন এবং এই মহাবিশ্বের যত সময় – তার সমন্বিত অবস্থা। এটা সবচেয়ে ট্রিকি। কারণ, এটাই একমাত্র অবস্থা, যেখান থেকে কেউ যেকোনো টাইমলাইনে ভ্রমণ করতে পারবে। অর্থাৎ বর্তমান থেকে অতীত কিংবা ভবিষ্যতে ভ্রমণ বা টাইম ট্রাভেল একমাত্র ফিফথ ডাইমেনশনেই সম্ভব। এখানে সময়ের মধ্য দিয়েই দেখা সম্ভব। কারণ ফোর্থ ডাইমেনশন হল সময় আর ফিফথ ডাইমেনশন হল মহাবিশ্বের সকল সময়, সব ইতিহাস, এখনো পর্যন্ত যত সময় হয়েছে বা হবে তার সমষ্টি। অর্থাৎ অসংখ্য ফোর্থ ডাইমেনশন।
যেহেতু ফিফথ ডাইমেনশনে থাকলেও সব কার্যকলাপের পরিধি থাকবে ফোর্থ ডাইমেনশনে, আবার যেহেতু ফোর্থ ডাইমেনশন হল সময়, তাই ফিফথ ডাইমেনশনে থাকাকালীন ফোর্থ ডাইমেনশন বা সময়ের উপর অবাধ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এখান থেকে যেকোনো outcome সম্ভব। প্যারালাল ইউনিভার্স অর্থাৎ এক একটা সম্ভাবনার জন্য এক একটা এক্সিস্টেন্স এই ডাইমেনশনে থেকেই প্রত্যক্ষ করা সম্ভব। অর্থাৎ কী হতো যদি ছোটোবেলায় এই স্কুলে না গিয়ে ঐ স্কুলে যেতেন, অমুক তারিখে এই জিনিসটা না খেয়ে ঐ জিনিসটা খেতেন, যদি আপনার ভাইটা মারা না যেতো – ইত্যাদি দেখা সম্ভব। তার মানে অসীম সম্ভাবনার জগত (Parallel universe of infinite possibilities)। আমরাও এই প্যারালাল ইউনিভার্সের একটা পার্ট।


সিক্সথ ডাইমেনশন ব্যাপারটি আরো জটিল এবং বিস্তৃত। এখান থেকে যেকোনো সম্ভাব্য ইউনিভার্সে গমন সম্ভব। আমদের দৃশ্যমান ইউনিভার্স মাত্র ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের পুরনো। তার মানে এই নয় যে, ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের ওপারে কিছু ছিলো না। আমাদের এই ইউনিভার্স বাদেও আর যত সম্ভাব্য জগত আছে, এই ডাইমেনশনে থেকে সেগুলোতেও গমন সম্ভব। অন্য ইউনিভার্সের কথা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটা বেশ যৌক্তিক। এটার নাম মাল্টিভার্স (ইন্টারনেট/বই ঘেঁটে আরেকটু স্পষ্ট হতে পারেন)। অর্থাৎ ইউনিভার্সের ভেতরে ও বাইরে আরো অনেক ইউনিভার্স। সিক্সথ ডাইমেনশনে থেকে এই মাল্টিভার্স ট্রাভেল সম্ভব। শুধু মাল্টিভার্স না, পাওয়া যাবে প্রত্যেক মহাবিশ্বের সকল ফিজিকাল বস্তু ও বস্তুর ধারণা, সব লজিক এবং ফিজিক্সের সূত্রের কনসেপ্ট ও তার অল্টারেশন এবং চূড়ান্তভাবে পুরো সৃষ্টির অস্তিত্বের ধারণা। এখান থেকে দেখলে সমগ্র সৃষ্টির কনসেপ্ট পাওয়া যাবে। এখান থেকে সৃষ্টি থাকা আর না থাকার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
এই লেখাটা নিতে হয়তো অনেকরই কষ্ট হয়েছে। হয়তো অনেকে এই লাইন পর্যন্ত আসেন নি। কিন্তু এখানে কেবল একটা কথাই খাটে, It’s not how it works or looks like. It’s how you feel and understand it. It’ll come quite logically if you can feel it and try to, actually try to understand it.

***References:
মুল পোষ্ট ঃ বিজ্ঞানযাত্রা
Images – Wiki, 9gag
The Fourth Dimension – by David Yonggi Cho
Hyperspace – Book by Michio Kaku
Time Warps, and the Tenth Dimension, Part I, chapter 3

Thursday, 11 June 2015

পুরুষদের স্তন ক্যানসার



স্তন ক্যানসারে নারীদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের এই ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এত দিন এই ক্যানসারের ব্যাপারে নারীদের সচেতন করার প্রচার প্রচারণা ছিল বেশি, কিন্তু এখন পুরুষদেরও সচেতন করার জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কারণ, পুরুষদের মধ্যেও স্তন ক্যানসার দেখা দিতে পারে। যদিও পুরুষদের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার খুবই কম। ভারতের দিল্লির বেসরকারি রকল্যান্ড হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান কে কে পান্ডে সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে পুরুষের স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
পুরুষের ঝুঁকি
স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের ঝুঁকি কিছুটা কম হলেও যদি স্তনে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে তবে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে পুরুষের হার মাত্র ১ শতাংশ। নারীর মতো পুরুষেরও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
ঝুঁকির কারণ
বিআরসিএ জিন মিউটেশন, ক্লিনফেল্টার সিনড্রোম, টেস্টিকুলার ডিজঅর্ডার, পরিবারে কারও স্তন ক্যানসার থাকলে, অ্যালকোহল, তামাক সেবন, শারীরিক পরিশ্রম না করা, স্থূলতার মতো কারণে উচ্চমাত্রার ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসৃত হলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পুরুষের ক্ষেত্রে খুব কমসংখ্যক ননফাংশনিং স্তন টিস্যু (যে টিস্যু দুধ তৈরি করতে পারে না) থাকে, যা স্তনের বোঁটার নিচে অবস্থান করে। নারীর মতোই পুরুষের স্তনে টিস্যু অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার ফলে ক্যানসার হয়।
উপসর্গ ও লক্ষণ
স্তনে যখন টিউমার ছোট থাকে তখন কোনো উপসর্গ বোঝা যায় না। এ অবস্থায় চিকিৎসা করা হলে তা দ্রুত সেরে যায়। এর জন্য শনাক্তকরণ নীতিমালা মেনে প্রাথমিক অবস্থাতেই তা নির্ণয় ও চিকিৎসা করা প্রয়োজন। যখন উপসর্গ তৈরি হয়, তখন পুরুষের ক্ষেত্রে বোঁটার নিচে ব্যথাহীন পিণ্ড দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ না-ও দেখা দিতে পারে। তবে ক্যানসার হলে স্তনবৃন্ত এলাকায় চামড়ায় পরিবর্তন দেখা দেয়।
পুরুষেরও স্তন ক্যানসার হতে পারে বলে সচেতন করেছেন ভারতের চিকিত্সকেরা।
স্তনের কোনো অংশ চাকা চাকা হয়ে যাওয়া অথবা কোনো লাম্প দেখা
স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন
স্তনবৃন্তের আকারে পরিবর্তন
স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত বা তরল পদার্থ বের হওয়া
স্তনবৃন্তের আশপাশে রাশ বা ফুসকুড়ি দেখা যাওয়া
বগল ফুলে যাওয়া বা চাকা দেখা দেওয়া
স্তনের অংশে গোটা ওঠা বা শক্ত হয়ে যাওয়া
রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা
সব বয়সের পুরুষ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগ চিকিৎসার জন্য আগে ক্যানসার কোষ শনাক্ত হওয়া প্রয়োজন। বায়োপসি করে টিস্যু নমুনার মাধ্যমে তা শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া পুরুষ নিজে স্তন ও স্তনবৃন্ত পরীক্ষা করে এবং মেমোগ্রাফ ও আলট্রাসাউন্ড পদ্ধতিতেও স্তন ক্যানসার ধরতে পারে। এই রোগের চিকিৎসার জন্য ক্যানসার কোন স্তরে রয়েছে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করতে হয়। প্রাথমিক অবস্থায় পুরুষের স্তন ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে তা অস্ত্রোপচার করে চিকিৎসা করা হয়। এ ছাড়াও রেডিয়েশন থেরাপি ব্যবহার করে অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার কোষ ধ্বংস করে ফেলা হয়। অথবা অস্ত্রোপচারের আগে টিউমারের আকার কমাতে রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়া হয়। এ ছাড়াও সিসটেমিক থেরাপি হিসেবে অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধ ইনজেকশন বা খাওয়ানো হয়। সিসটেমিক থেরাপির মধ্যে রয়েছে বায়োলজিক থেরাপি, কেমোথেরাপি ও হরমোন থেরাপি।

Sunday, 7 June 2015

পেগাসাসের খোঁজে...

পেগাসাস নামটা পরিচিত লাগছে কি? 


ছোটবেলায় পেগাসাস শুজ নামে একটা জুতার বিজ্ঞাপন দেখতাম। এরপর কিশোরবেলায় জানলাম, গ্রীক পুরাণের একটি চরিত্র হল পেগাসাস নামক ঘোড়া। আরও পরে বুঝলাম, বাংলা রূপকথায় যে পঙ্খীরাজ বা পক্ষীরাজ ঘোড়ার কথা বলা হয়, সেটা পেগাসাসেরই বাংলা ভার্সন!


আজ চলুন পড়ি ডানাওয়ালা এক ঘোড়ার গল্প, যাতে সওয়ার হয়ে ছোটবেলায় ডালিম কুমার আর বেদানা কুমারীর চরিত্রে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমরা।

পেগাসাসের জন্ম হল কিভাবে??? 

দানবী মেডুসা এবং দেবতা পসাইডনের (সাগর আর ঘোড়ার দেবতা) সন্তান হল পেগাসাস। সাদা রঙের বিখ্যাত এই পশুর জন্মের প্রক্রিয়া মানুষের মত মামুলি হবে, তাই কি হয়? তাই আজব এক ঘটনার মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল উড়ন্ত এই ঘোড়া।

[খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রীসে নির্মিত পেগাসাসের ব্রোঞ্জ মূর্তি] 


তরুণ গ্রীক বীর পার্সিয়াস এক কঠিন সংকল্প হাতে নিয়েছিল - বীভৎস দানবী মেডুসাকে হত্যা করার। কিন্তু কে এই মেডুসা?
মেডুসা হল গ্রীক পুরাণের সেই চরিত্র, যার মাথায় চুলের বদলে সাপ কিলবিল করত। সে দেখতে এতই কুৎসিত ছিল যে, কেউ ওর চোখের দিকে তাকালেই পাথরে পরিণত হত। কেন তার এই হাল হয়েছিল, সে আরেক গল্প।

অনেক বছর ধরে পার্সিয়াস মেডুসাকে খুঁজে বেড়াল। শেষমেশ যখন পেল তখন দেখল, মেডুসা তার দুই বোনকে (একত্রে তিন বোনকে গর্গন বলে) নিয়ে কিছু পাথুরে মূর্তির মাঝে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। এগুলো হল সেইসব বীরের মূর্তি, যাদের মেডুসা তার ভয়ঙ্কর চাহনী দিয়ে পাথর বানিয়েছিল।

কিন্তু অন্যান্য দেবতার সাথে আলোচনা করে পার্সিয়াস জেনে এসেছিল মেডুসা বধের কৌশল। তাই সে সরাসরি মেডুসার দিকে না তাকিয়ে মসৃণ এক ঢালের মাধ্যমে মেডুসাকে দেখল। ফলে মেডুসার যাদু পার্সিয়াসকে বশ করতে পারল না এবং পার্সিয়াস একটা কাস্তে দিয়ে ওর কদাকার মাথাটা কেটে ফেলল। মেডুসার কাটা ঘাড় দিয়ে যখন গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগল, তখন সে রক্ত থেকেই জন্ম নিলো পেগাসাস ঘোড়া আর তার মানুষ ভাই - খ্রিসাওর।

[খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫-৪৭৫ সালের এই চিত্রকলায় দেখা যাচ্ছে, ডানদিকে আলখেল্লা পরা এবং বর্শা হাতে দেবতা হার্মি‌স, তার পরে বর্শা হাতে পার্সি‌য়াস, তার পরে দেবী এথেনা, তার পরে মেডুসার এক বোন, এরপর মাথা কাটা মেডুসা, সবশেষে আরেক বোন। আর মেডুসার মাথা কাটার পর ওর দুইপাশে জন্ম নেওয়া সন্তান - পেগাসাস আর খ্রিসাওর] 


মেডুসার মৃত্যু দেখে বাকী দুই বোন ক্রোধে পাগল হয়ে পার্সিয়াসকে ধাওয়া করলো। কিন্তু পেগাসাস তার পিঠে চড়ার জন্য পার্সিয়াসকে অনুমতি দিলে, দুজনে মিলে নিরাপদ গন্তব্যে পালিয়ে যেতে পেরেছিল।

কবি হেসোয়েডের মতে, পেগাসাস নামটা এসেছে pegai (ঝর্ণা) এবং Okeanos (যে জায়গায় পেগাসাস জন্মেছিল) থেকে। ১৯৫২ সালে উদ্ভূত আরেক সূত্রমতে, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা “Luwian”-এ pihassas মানে বিদ্যুৎ। সেখান থেকেই পেগাসাস নামের উৎপত্তি। কারণ জিউস পেগাসাসকে করেছিলেন বজ্র আর বিদ্যুতের বাহক।

পার্সিয়াস ছাড়া পেগাসাসের জীবন ঃঃঃ
  
পার্সিয়াসের মৃত্যু পর্যন্ত পেগাসাস তার সেবা করেছে। এরপর সে মিউজদের (Muses হলেন নয়জন বোন, যারা শিল্পকলা, সঙ্গীত এবং বিজ্ঞানের দেবী) বাসস্থান হেলিকন পর্বতে যায়। সেখানে যে পবিত্র ঝর্ণাটি মিউজদের কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগাতো, সেটা শুকিয়ে গিয়েছিল। পেগাসাস তার খুর দিয়ে একটা পাথরের উপর এত জোরে আঘাত করে যে, পাথর ভেঙে ঝর্ণার সৃষ্টি হয়। ঝর্ণাটির নাম হিপোক্রিন। কথিত আছে, যারা এই ঝর্ণার পানি খেত, তারা কবিতা লেখায় পারদর্শী হয়ে উঠত।

 বেলেরোফনের সঙ্গী পেগাসাসঃঃঃ

মানুষের হাতে সহজে বশীভূত হওয়ার বান্দা পেগাসাস নয়। তারপরও যে দুজন বীর একে বশীভূত করে পিঠে উঠতে পেরেছিল, তারা হল পার্সিয়াস এবং বেলেরোফন। পার্সিয়াসের কথা আগেই জেনেছি। এবার জানবো দেবতা পসাইডনের আরেক পুত্র গ্রীক বীর বেলেরোফনের কাহিনী। সে কীভাবে ঠাণ্ডা করেছিল পরাক্রমশালী এই পশুকে, সে কাহিনী।

কথিত আছে, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা পলিআইডোস বেলেরোফনকে বলেন অ্যাথেনা দেবীর মন্দিরে গিয়ে ঘুমাতে। সেখানে রাতের বেলা দেবী বেলেরোফনের কাছে আসেন এবং তাকে একটা সোনার তৈরি লাগাম উপহার দেন। পরদিন সকালে লাগাম হাতে নিয়েই বেলেরোফন পেগাসাসকে খুঁজতে বের হয়। পেগাসাস তখন মিউজদের পবিত্র ঝর্ণা ‘পিয়েরিয়ান’ থেকে পানি খাচ্ছিল। এমন অবস্থায় বেলেরোফন ঘোড়াটিকে পাকড়াও করে আর ধীরে ধীরে তাকে শান্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর পেগাসাস বেলেরোফনকে তার সওয়ার হতে অনুমতি দেয়। পেগাসাসে চড়ে বেলেরোফন কুখ্যাত দানব কাইমেরাকে হত্যা করতে রওনা হয় এবং বিখ্যাত সেই যুদ্ধে জয়ী হয়। কাইমেরা ছিল আদতে একটি সিংহ, যার পিঠ ফুঁড়ে বের হয়েছে ছাগলের মাথা আর লেজের শেষে আছে সাপের মুখ।

[১৯১৪ সালে ম্যারি হ্যামিল্টন ফ্রে এঁকেছিলেন এই চিত্রটি, যার শিরোনাম "Yes, there he sat, on the back of the winged horse!" এতে দেখা যাচ্ছে, পেগাসাসকে শান্ত করে তার পিঠে চড়েছেন বেলেরোফন] 


গৌরবান্বিত এই জয়ের পর বেলেরোফন নিজেকে দেবতাদের সমতুল্য ভাবতে শুরু করে। সে পেগাসাসকে জোর করতে থাকে তাকে অলিম্পাস পর্বতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পেগাসাস রাজী হয় বটে, কিন্তু বেলেরোফনের এই ঔদ্ধত্য দেবতাদের রাগিয়ে দেয়। জিউস একটা মাছি পাঠান পেগাসাসকে কামড়ানোর জন্য। মাছির কামড়ের চোটে পেগাসাস পিছু হটে বেলেরোফনকে সজোরে ছুঁড়ে মারে মাটিতে। এর ফলে গ্রীক বীর চিরকালের মত পঙ্গু হয়ে যায়। কিন্তু পেগাসাস ঠিকই অলিম্পাসের দিকে উড়ে যেতে থাকে আর একসময় পৌঁছে যায় সেখানে।

পেগাসাসের শেষ পরিণতি ঃঃ

অলিম্পাস পর্বতে পৌঁছানোর পর পেগাসাসকে ইওসের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ইওসের কাজ ছিল আকাশের বুক থেকে রাত হটিয়ে ভোর নিয়ে আসা। পেগাসাস জিউসের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের পিঠে করে বজ্র আর বিদ্যুৎও সরবরাহ করত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পেগাসাস অলিম্পাসেই জিউসের ফাই ফরমাশ খেটে কাটিয়েছে। মৃত্যুর পর জিউস তাকে নক্ষত্রপুঞ্জে পরিণত করেন আর আকাশে ঠাঁই দেন। 

[ইরানে খনন করে পাওয়া গেছে পার্থি‌য়া আমলের এই ব্রোঞ্জ প্লেট, যাতে খোদাই করা আছে পেগাসাসের ছবি]


টুকুটাকিঃঃঃ

পেগাসাস ছিল দয়ালু আর সাহায্যকারী। এর কোন লোভ ছিল না। তবে পেগাসাসের প্রতীক সময়ের সাথে সাথে বদলেছে। মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁ পর্যন্ত একে ভাবা হত জ্ঞান আর খ্যাতির প্রতীক। ঊনিশ’শো শতাব্দীতে এসে সে হয়ে গেল কবিতার প্রতীক। তার খুরের আঘাতে যেসব পানির উৎস সৃষ্টি হত, সেগুলো থেকে পান করলে কবিতা লেখার উৎসাহ জন্মাত।

বাস্তব জীবনে পেগাসাসঃঃঃঃ

পেগাসাসের নামে একটি নক্ষত্রপুঞ্জের নামকরণ করা হয়েছে, যেটা আপনি খালি চোখেই দেখতে পাবেন। এটি উত্তর আকাশে অবস্থিত।  

[উত্তর আকাশে দৃশ্যমান পেগাসাস নক্ষত্রপুঞ্জ]  


খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর গ্রীক মৃৎশিল্পে, বিশেষ করে করিন্থ শহরের পণ্যসামগ্রীতে পেগাসাসের অনেক প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে করিন্থের মুদ্রায়ও পেগাসাসের নকশা খোদাই করতে দেখা গেছে। রোমান চিত্রকলার ক্ষেত্রেও বেলেরোফন আর পেগাসাসের কাহিনী অনেক জনপ্রিয় একটি বিষয় ছিল। রেনেসাঁ আমলের অনেক ভাস্কর্যেও পেগাসাসকে পাওয়া যায়।

[খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০-৩০০ সালে গ্রীসের করিন্থ শহরে প্রচলিত রৌপ্যমুদ্রা, যাতে খোদাই করা আছে পেগাসাসের অবয়ব(বামে)। এটি ১৩ মিলিমিটার প্রশস্ত এবং এর ওজন ১.৩৯ গ্রাম]


যদিও পুরাণে পেগাসাসের চরিত্রটির ব্যাপ্তি খুব ছোট, পার্সিয়াস আর বেলেরোফনের বাহক হওয়া এবং জিউসের জন্য বজ্র সরবরাহ করা ছাড়া তার কাজকর্ম সম্পর্কে তেমন উল্লেখ নেই, তবুও এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি চরিত্র। সেই প্রাচীন গ্রীসের মৃৎশিল্প থেকে শুরু করে আজকালকার কর্পোরেট লোগোতে পর্যন্ত পেগাসাসের অবয়ব দেখা যায়।   
... 
আরও জানতে চাইলে নিচের লিঙ্ক গুলো দেখুন ঃ
মুল পোষ্ট
* Homer's Iliad (c. 800-600 BC) 

Thursday, 4 June 2015

ইউনিকর্ন...

 

প্যাঁচানো শিংওয়ালা ইউনিকর্ন
প্যাঁচানো শিংওয়ালা ইউনিকর্ন

লোককাহিনী এবং পুরাণে বর্ণিত বিভিন্ন পশুর মধ্যে বোধহয় ইউনিকর্ন এবং ড্রাগনের নামই সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত! চলুন আজ কথা বলি ইউনিকর্ন নিয়ে।
ছোটবেলা থেকেই এই শিংওয়ালা ঘোড়ার গল্প আমরা পড়ে এসেছি। এটার এমনই আকর্ষণ যে, বড় হয়েও কোথাও ইউনিকর্নের নাম শুনলে একটু ঢুঁ মেরে বসি উৎসটায়।

পাশ্চাত্য সাহিত্যই ইউনিকর্নকে নিয়ে লম্ফঝম্ফ করে বেশী। সেখান থেকে আমাদের ধারণা হয়েছে, এরা আসলে সাদা রঙের ঘোড়া। স্বাভাবিক ঘোড়া থেকে এদের একটাই পার্থক্য – কপাল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা চোখা শিং। এই শিং কোন ছবিতে মসৃণ, আবার কোন ছবিতে প্যাঁচানো।

মসৃণ শিংওয়ালা ইউনিকর্ন
মসৃণ শিংওয়ালা ইউনিকর্ন

এই শিঙের আছে জাদুকরী ক্ষমতা। এটি বিভিন্ন রোগ ভালো করতে এবং বিষ শনাক্ত করতে পারে। এই তো, ১৭৪১ সালের দিকেও ইউরোপে নারওয়াল তিমির দাঁতকে ইউনিকর্নের শিং হিসেবে বর্ণনা দিয়ে সেটার গুঁড়োকে ওষুধ হিসেবে বিক্রি করা হত।

শক্তিশালী এবং হিংস্র ইউনিকর্নের একটাই দুর্বলতা। সেটা হল, কুমারী মেয়ে। এরা কুমারীকে দেখলে শান্ত হয়ে তার কোলে লুটিয়ে পড়ে আর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়। এই কৌশলকে কাজে লাগিয়ে শিকারিরা বন্দী করে ইউনিকর্নকে।

খুব সম্ভবত ডোমেনিকো জাম্পিয়েরির আঁকা ফ্রেস্কো, যেখানে দেখানো হয়েছে কুমারীর কোলে ইউনিকর্নের আশ্রয়খুব সম্ভবত ডোমেনিকো জাম্পিয়েরির আঁকা ফ্রেস্কো, যেখানে দেখানো হয়েছে কুমারীর কোলে ইউনিকর্নের আশ্রয়

আজ আমরা জানবো এই ইউনিকর্ন তথা একশৃঙ্গের কিছু মজার আর অজানা তথ্য, যা আপনাদের নিঃসন্দেহে আমোদিত করবে।

ইউনিকর্ন আসলে কি ????

খুব সহজে ইউনিকর্নের পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একেক অঞ্চলের লোকগাঁথায় একেকভাবে উঠে এসেছে রহস্যময় এই প্রাণীর বর্ণনা। বিখ্যাত অনেক ব্যক্তিও ইউনিকর্নকে নিয়ে গবেষণা করেছেন। জেনে রাখা ভালো, প্রাচীন গ্রীসের প্রাকৃতিক ইতিহাসে বা মধ্যযুগ এবং রেনেসাঁ আমলের ইউরোপে ইউনিকর্নের কথা উল্লেখ থাকলেও এটির উৎপত্তিস্থল হিসেবে ধারণা করা হয় ভারতীয় উপমহাদেশকে!

ইউনিকর্ন নিয়ে সবার প্রথমে হয়ত গ্রীক ইতিহাসবিদ “তিসিয়াস” লিখেছিলেন। তাঁর “Indika ("ভারতে")” বইটিতে ইউনিকর্নের বর্ণনা দেওয়া আছে এভাবে – বন্য গাধা, দ্রুতগামী, সাতাশ ইঞ্চি লম্বা শিং আছে (যেটার রঙ সাদা, লাল, কালো)। এরিস্টটলও দুই ধরণের “একশৃঙ্গ বিশিষ্ট প্রাণী”র কথা বলেছেন, যথা – অরিক্স (এক ধরণের এন্টিলোপ) এবং ভারতীয় গাধা।

অরিক্স, যার কথা বলেছেন এরিস্টটল। কিন্তু তিনি, যেকোনো কারণেই হোক, ভুল করে অরিক্সকে ভেবেছিলেন একশৃঙ্গী প্রাণী।অরিক্স, যার কথা বলেছেন এরিস্টটল। কিন্তু তিনি, যেকোনো কারণেই হোক, ভুল করে অরিক্সকে ভেবেছিলেন একশৃঙ্গী প্রাণী।

রোমান লেখক এলিয়ান তাঁর “On the Nature of Animals ” বইয়ে বলেছেন, ভারতে এক শিংওয়ালা ঘোড়া পাওয়া যায়। এছাড়া রোমান প্রকৃতিবিদ প্লাইনি দ্য এল্ডার-ও এক শিংবিশিষ্ট ভারতীয় ষাঁড়ের কথা উল্লেখ করেছিলেন (ধারণা করা হয়, তিনি গণ্ডারের কথা বলেছেন)। এছাড়া তিনি পুরুষ হরিণের মাথা, হাতির পা, পুরুষ শূকরের লেজ এবং ঘোড়ার দেহবিশিষ্ট একটি প্রাণীর কথা বলেছেন, যার কপালের মাঝখান থেকে তিন ফুট লম্বা একটি কালো রঙের শিং গজিয়েছে।

মিশরীয় বণিক কসমাস (যিনি ষষ্ঠ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন) ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন। সে সময় ইথিওপিয়ার সম্রাটের রাজপ্রাসাদে তিনি ব্র্যাসের তৈরি চারটি ইউনিকর্ন মূর্তি দেখেন এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে ইউনিকর্ন সম্পর্কে যা জানেন তা হল, জীবিত অবস্থায় এই হিংস্র পশুকে ধরা অসম্ভব। এদের সকল শক্তি শিংয়ে।     

ইউরোপীয় লোকগাঁথায় ইউনিকর্নকে দেখা হত সাদা ঘোড়া, গাধা বা ছাগলের আদলে, যার লম্বা একটা শিং, চেরা খুর আর ছাগলের মত দাড়ি আছে। মধ্যযুগ আর রেনেসাঁ আমলের ইউরোপে ইউনিকর্নকে মনে করা হত প্রচণ্ড হিংস্র এক বন্য পশু, যা বিশুদ্ধতা আর মহিমার প্রতীক, এবং যাকে শুধুমাত্র কুমারী মেয়েরাই বন্দী করতে পারে।

ইতালির রাভেন্না প্রদেশের "সান জোভান্নি এভাঞ্জেলিস্তা" চার্চে ১২১৩ সালে মোজাইক দিয়ে নির্মিত ইউনিকর্নের প্রতিকৃতিইতালির রাভেন্না প্রদেশের "সান জোভান্নি এভাঞ্জেলিস্তা" চার্চে ১২১৩ সালে মোজাইক দিয়ে নির্মিত ইউনিকর্নের প্রতিকৃতি

তবে তেরো’শ শতাব্দীর বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো এই মধ্যযুগীয় ইউনিকর্নের বর্ণনায় পানি ঢেলে দেন। তিনি দাবী করেন যে, জাভাতে তিনি ইউনিকর্ন দেখেছেন। প্রাণীটি সম্পর্কে পোলো বলেন, “হাতি থেকে সামান্য ছোট, মহিষের মত লোমযুক্ত, হাতির মত পা-ওয়ালা, কপালের মাঝখান থেকে কালো রঙের শিং গজানো, পুরুষ শূকরের মত মাথাযুক্ত অত্যন্ত কুশ্রী একটি জন্তু। এরা নোংরা কাদায় গড়াগড়ি করে সময় কাটায়। এরা কোনোমতেই কুমারী মেয়ে দ্বারা বন্দী হওয়ার মত প্রাণী নয়। বরং আমাদের মতবাদের পুরো উল্টো বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রাণী!”
তবে আশাহত হওয়ার কিছু নেই। কারণ পোলো যাকে দেখে ইউনিকর্ন মনে করেছিলেন, সেটি আদতে ইউনিকর্নই নয়। জাভা দেশীয় গণ্ডার!

তো আমরা কী দেখতে পাচ্ছি?
ইউনিকর্ন নিয়ে নির্দিষ্ট কোন মতবাদ নেই। বিভিন্ন জায়গায় এর দৈহিক বর্ণনা বিভিন্ন কিসিমের।
এর কারণ কী?
সম্ভাব্য কারণ হতে পারে –

১) প্রাণীটিকে কেউই সরাসরি দেখে নি। শুধু লোক মুখে শুনে বিশ্বাস করেছে এবং নিজের মনমত রঙচঙে বর্ণনা বানিয়ে পরবর্তী প্রজন্মে চালান করেছে;  

২) যদি কেউ দেখেও থাকে, সে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বক্তব্য ছাড়া কোন প্রমাণ রেখে যেতে পারে নি। তাই প্রাণীটি আসলে দেখতে কেমন, সেটা কেউ জানে না কিন্তু বর্ণনা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে;

৩) এক শিং ভাঙা অরিক্স বা এন্টেলোপ দেখে ইউনিকর্নের জন্ম দিয়েছে মানুষ। হয়ত শিকার করতে গিয়ে বা শিকারির হাত থেকে নিজেকে রক্ষার সময় দুটো শিংয়ের মধ্যে একটি হারাতে হয়েছে ওদের কাউকে। আর সেটি দেখেই মানুষ ভেবে নিয়েছে, এক শিংওয়ালা প্রাণী! এরপর নিজেদের মত কাহিনী তৈরি করে সেটা ছড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব কিছু না। আর বক্তব্য বিকৃত হতেই বা কতক্ষণ?

এক শিং ভাঙা অরিক্সএক শিং ভাঙা অরিক্স

৪) Elasmotherium নামক ইউরেশীয় অঞ্চলের এক বিলুপ্ত প্রজাতির গণ্ডার থেকে ইউনিকর্নের কাহিনী এসেছে। এটি দেখতে কিছুটা ঘোড়ার মত এবং কপালে বড়সড় এক শিংয়ের অধিকারী।

বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া Elasmotherium গণ্ডারবিলুপ্ত হয়ে যাওয়া Elasmotherium গণ্ডার

দেখা যাচ্ছে, তিন এবং চার নাম্বার যুক্তিই সবচেয়ে জোরালো যুক্তি।

আর আধুনিক যুগে তো ইউনিকর্নকে বানানো হয়েছে আরও রঙচঙে। এখনকার ইউনিকর্ন রঙধনুতে চড়ে চলাফেরা করে।

এখন আসছি লাখ টাকার প্রশ্নেঃ

ইউনিকর্ন কি ছিল নাকি পুরটাই মনগড়া ???

যদিও অনেকের ধারণা, ইউনিকর্নের অস্তিত্ব একসময় ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে বাস্তববাদীরা এই ধারণা মেনে নেন না।

জার্মানির হার্জ পর্বতের ইউনিকর্ন নামক গুহায় প্রাগৈতিহাসিক আমলের অনেক হাড়গোড় পাওয়া গিয়েছিল। মাগদেবার্গ শহরের মেয়র অটো ভন গুয়েরিকে সেসব হাড়ের মধ্যে ইউনিকর্নের হাড় আছে বলে মনে করেছিলেন এবং ১৬৬৩ সালে কিছু হাড়কে জোড়া লাগিয়ে তৈরি করেছিলেন দুই পা-ওয়ালা ইউনিকর্নের কংকাল। কিন্তু বিধি বাম! পরবর্তীতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এসব হাড় ইউনিকর্নের নয়; বরং গণ্ডার এবং ম্যামথের ফসিল হওয়া হাড়। সাথে ছিল নারওয়ালের দাঁতের ফসিল।

অটো ভন গুয়েরিকের তৈরি ইউনিকর্নের কংকাল
অটো ভন গুয়েরিকের তৈরি ইউনিকর্নের কংকাল

নারওয়াল তিমি। এর দাঁত দেখলে ইউনিকর্নের শিঙের কথা মাথায় আসা স্বাভাবিক!নারওয়াল তিমি। এর দাঁত দেখলে ইউনিকর্নের শিঙের কথা মাথায় আসা স্বাভাবিক!

কোন বিলুপ্ত হওয়া প্রাণীর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় ফসিলের মাধ্যমে। ডাইনোসরের কথা আমরা এভাবেই জেনেছি। কিন্তু ইউনিকর্নের কোন ফসিল আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। ফলে এটাকে একটা মিথ হিসেবেই আমাদের গ্রহণ করতে হচ্ছে। কিন্তু তারপরও কথা থাকে।

যদি একেবারেই ইউনিকর্ন নামক প্রাণীটির অস্তিত্ব না থাকতো, তাহলে সিন্ধু সভ্যতার দুটো প্রধান শহর – হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোতে কেন পাওয়া গেল ইউনিকর্নের আকৃতি সম্বলিত সীল? খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ সালের সীলগুলোতে সিন্ধুর ভাষাও লেখা আছে। এই সীলগুলো এখনও গবেষকদের ভাবিয়ে চলেছে।

সিন্ধু সভ্যতার সময়কার সীলে খোদাই করা ইউনিকর্ন আকৃতির প্রাণীসিন্ধু সভ্যতার সময়কার সীলে খোদাই করা ইউনিকর্ন আকৃতির প্রাণী

সিন্ধু সভ্যতার সময়কার সীলে খোদাই করা ইউনিকর্ন আকৃতির প্রাণীসিন্ধু সভ্যতার সময়কার সীলে খোদাই করা ইউনিকর্ন আকৃতির প্রাণী

তবে তাঁরা রহস্য উদ্ঘাটন করতে চেয়েছেন এভাবে - সীলে ইউনিকর্নের মত যে প্রাণীটি দেখা যাচ্ছে, সেটা ওরক (aurochs) নামের একটি বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণী বা তার থেকে উদ্ভূত প্রজাতি। এবং সীলে একশৃঙ্গ বিশিষ্ট কোন প্রাণী দেখা যাচ্ছে না। বরং ওরকের একপাশের শিং দেখা যাচ্ছে।

Aurochs নামক বিলুপ্ত প্রজাতি
Aurochs নামক বিলুপ্ত প্রজাতি

কে জানে, এই তথ্যগুলো শুধু দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য গবেষকরা বের করেছেন কিনা! কারণ ফসিল পাওয়ার সময় শেষ হয়ে যায় নি। আর এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ইউনিকর্ন কখনো ছিল না। 
...... ...... ...... ...... 
যারা সত্যজিৎ রায়ের ভক্ত, তারা আশা করি “একশৃঙ্গ অভিযান” উপন্যাসটি পড়েছেন। আর যারা পড়েন নি, তারা রায়ের অসাধারণ সৃষ্টি ‘প্রফেসর শঙ্কু’র এই অমানবিক অভিযানটি পড়ে ফেলতে পারেন। ইউনিকর্নের সাথে যোগসূত্র আছে বলেই অনুরোধটি করছি। 
...