একটা সময় ছিল, সবাইকেই বিশ্বাস করতাম। সবকিছুই খাঁটি ভাবতাম। তারপর মা বলল, গোয়ালা গরুর দুধে জল মেশায়। মানে সব গোয়ালাই মেশায়। খুব স্বাভাবিক ব্যাপার এটা। ধাক্কা লাগল। তবুও ভাবতাম, আরে ঠিক আছে, যা দেখছি, যা শুনছি তা ঠিক না হয়ে যায়ই না। তারপর একদিন কোন একটা পুজোবার্ষিকীতে পড়লাম আর্মস্ট্রং, অলড্রিন, কলিন্সের নাম মুখস্থ করে সিম্পলি বোকা বনেছি। আমেরিকা গোটাটাই ধোঁকা দিয়েছে। তখন খেয়াল পড়ল, আরে তাই তো! চাঁদে পতাকা ওড়ে কেমনে? এক ষষ্ঠাংশ ওজন নিয়ে রুক্ষু মাটির বুকে জুতোর ছাপ পড়ে কেমনে? অতএব, ইতিহাস বইয়েও ঘাপলা? তাও নিজেকে বললাম, আরে ঠিক আছে, অমন দু'একটা হয়ে থাকবে। বাকি সবাই অন্তত যা বলছে তাইই বলতে চাইছে, করতে চাইছে। একদিন জানতে পারলাম 'রিয়েলিটি শো' এর নাকি স্ক্রিপ্ট থাকে। হাসি- কান্না- ঝগড়া- ওহ শিট- ইয়াহহু সব নাকি মেপে! খেয়েছে! একি রে ভাই! কোথায় যাই তবে! আরেকটু বড় হলাম। দেখি কৈশোরের আদর্শদের মধ্যেও ঘোঁট পেকে একশা। কুড়ির কোঠায় পৌঁছে আদর্শ জিনিসটার ঘনচক্কর বুঝে জন্মের মত 'আদর্শ মানব-টানব' এর টান কাটিয়ে দিলাম।
তারপর এলাম ইন্টারনেটে। লে হালুয়া। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি ওবামার পাশে তুমুল ঘ্যাম নিয়ে মোদি হেঁটে আসছেন করিডোর বেয়ে, দেখেই শ্রদ্ধা পেয়ে যায়, বিশ্বাসও করলাম অনেকদিন ধরে, হঠাৎ দেখি ছবি ফেক। ফটোশপ করা! তারপর দেখি নিউটনের ছবি চিপকে তিনি জীবনে যা বলেননি তাই লিখে ফেবুতে পোস্টার। তারপরে আরও দেখি একটা ছবিতে দুইখান টিরেন- দুটো কনভার্জিং ট্র্যাকে ছুটে আসছে- ছবিতে লেখা 'লাইক করে লিখুন স্টপ, আর দেখুন কী হয়'। হা আল্লে্হশ্বর, হা বুদ্ধৃষ্ট, সেই ছবিতে সাড়ে তিন লাখ লাইক আর পৌনে চার লাখ 'স্টপ' লেখা কমেন্ট!
ঠিক এই জায়গায় এসে আমি নিজের ওপর প্রবলভাবে বিশ্বাস হারাতে শুরু করলাম। ভীষণ সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করলাম নিজেকে। দিন গেল। জানতে পারলাম আমার ঘরের দেওয়ালে দেশের যে মানচিত্র ঝোলে সেটা মোটেও ঠিক মানচিত্র নয়। ফুল ঘাপলা। বুঝতে পারলাম নেতা যখন বলছে 'আমি এই করেছি, এই করি' তখন সেটা পুরোটাই গুল-মার্গ কেস। অথচ, আমি ভাবতে থাকি একটা লোক লক্ষটা লোকের সামনে চোখমুখ স্বাভাবিক রেখে চিৎকার করে একটা মিথ্যে বলছে, কীভাবে? না না, হতেই পারে না। আমি দ্বিগুন অবিশ্বাসী হয়ে যাই নিজের ওপর।
তারপর দেখি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ইজুক্যালটু বিলিয়ন ডলার ঘাপলা, সাদ্দাম হত্যা ইজুক্যালটু অন্য কেস, এমনকি মিশন জেরোনিমোও নাকি ঘাপলা। আগেই শুনেছিলাম, দিন কয়েক আগে অ্যাসাঞ্জ বললেন, আরে লাদেনবাবু দিব্য বেঁচে রয়েছেন তো! তবে যে! অ্যাওয়ার্ড উইনিং সিনেমা- ফিনেমা হয়ে গেল! হা আল্লে্হশ্বর!
আমি মাইরি সেই 'সবাইকে বিশ্বাস করি, সবই খাঁটি' থেকে 'কাউকেই বিশ্বাস করি না, সবই সন্দেহজনক'এ ল্যান্ড করেছি। মাঝে তো এই 'সবই সাজানো' থিয়োরি দ্বারাও প্রবলভাবে নাড়া খেয়েছিলাম। দিদি যে আমার এই বিশ্বাসহীনতার জার্নির অনেক আগেই এ পথে হেঁটেছেন ও ধর্নামঞ্চ বেঁধে রীতিমতো অনশন করে এই 'সবই চক্রান্ত' উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন তা আমায় গভীরে নাড়া দেয়। ফলে, আমি জানি, আজ যে বেগুন কিনব হাসিমুখে কাল তাতে পোকা বেরোবেই। আজ যার আগুন দেখব বাসিমুখে কাল সে বোকা বেরোবেই। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, রাস্তায় সমস্ত নেড়িরই জলাতঙ্ক আছে এবং সবাই আমার দাবনায় দাঁত বসাবার গুপ্ত ইচ্ছা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু বেঁচেবর্তে থাকতে হবে তো! ফলে নেড়ি দেখলেই ঢিল নিয়ে তেড়ে যাওয়া যায় না। পাবলিক দায়িত্ব নিয়ে রাঁচি দিয়ে আসবে। ফলে লাভের লাভ, তুমুল সাবধান হয়ে গেছি। পকেটে ঢিল নিয়ে ঘুরি অলটাইম। এই অ্যাকুয়ার্ড সন্দেহটার আরেকটা হেব্বি দিক আছে। ছবি হাফ পেরোতে না পেরোতেই শাটার আইল্যান্ড বুঝে যাই, মেমেন্টোও জলবৎ তরলং।
মুশকিল হয় যখন একটা ঘটনা ঘটে আর তাতে সবাই আলোড়িত হয়ে যায়। আমি আর আলোড়িত হতেই পারিনা। ঘটনার রঙ্গমঞ্চে তাকিয়ে যেই আবেগতাড়িত হতে যাব অমনি নিওকর্টেক্স থেকে আওয়াজ আসে, সামলে বাপু সামলে। একটু থাম। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার মাথায় এক বালতি বরফ ঢাললে আমার প্রথমে রিয়্যাকশান হবে, ইহা কি সত্যিই বরফ? কে ঢালিল? সে কি সত্যিই বরফ ঢালিয়াছে? তার পনের মিনিট পর আমি হিহি কাঁপব। খুব জটিল পরিস্থিতি সন্দেহ নেই, কিন্তু নিজের উদাহরণ দিয়ে বোঝালাম বলে হাফ-সিরিয়াস হয়ে ব্যাপারটা নেবেন না প্লিজ। আর তাছাড়া, নিজেকে দিয়ে না বলে আর উপায় কি? সবাই অফেন্ডেড হয়, সব্বার গায়ে লাগে। বুঝিই না বাপু কী নিয়ে কথা বলব? অন্তত সন্দেহের কথাও আর কি।
ফলে, বিশ্বাস করে ফেলেছি, সন্দেহই মূল ব্যাপার। সব্বার নিজস্ব হিডেন অ্যাজেন্ডা ভাই। যে যা বলছে, সে আসলে তা বলছে না। আমি যা দেখছি, আসলে সে জিনিস ঘটছে না। কিন্তু এগেন, এভাবে টানা যাচ্ছে না, যায় না।
ফলে একশ বছর পেরিয়ে যখন গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ এর উপস্থিতি প্রমাণিত হয় তখন আমি প্রবল উত্তেজিত হয়ে পড়ি। যদি চর্চা করতে হয় ভাই বিজ্ঞানচর্চা করব। অ্যাপ্লায়েড না, পিওর।
বা সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্র- এসব। ঘুরতে টুরতে যাব। নদীর জল ছুঁয়ে দেখব, পাহাড়ে চড়ব নিজে। গোদাবরী আর পশ্চিমঘাট যে আদৌ আছে, সে জিনিস বিশ্বাস করাও চাপ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
পৃথিবীকে তো আর নেড়িশূন্য করা যাবে না, ফলে শিশুর বাসযোগ্য করতে হলে শিশুর নিওকর্টেক্সে বাস করা পৃথিবীটাকেই নেড়েচেড়ে দেখতে হবে। নিন্দুক বলিল, আপনার এই সিদ্ধান্তকেও সন্দেহের চোখে দেখার কোনও কারণ নেই বলছেন? সম্পূর্ণ নিজস্ব জিনিস? অ্যাজেন্ডা রহিত?
তবে রে! পকেট থেকে ঢিল বের করি। জোরে জোরে মন্ত্র আওড়াই, Cogito ergo sum, cogito ergo sum... খবরে দেখতে পাই, দেশবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে নাকি দেশাত্মবোধক এক ব্যক্তি, সির্ফ অন্যের মুখে কালি লেপার জন্য। হা আল্লে্হশ্বর!
সুত্র ঃ অনিক চক্রবর্তী, গ্লোমি সানডে।
তারপর এলাম ইন্টারনেটে। লে হালুয়া। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি ওবামার পাশে তুমুল ঘ্যাম নিয়ে মোদি হেঁটে আসছেন করিডোর বেয়ে, দেখেই শ্রদ্ধা পেয়ে যায়, বিশ্বাসও করলাম অনেকদিন ধরে, হঠাৎ দেখি ছবি ফেক। ফটোশপ করা! তারপর দেখি নিউটনের ছবি চিপকে তিনি জীবনে যা বলেননি তাই লিখে ফেবুতে পোস্টার। তারপরে আরও দেখি একটা ছবিতে দুইখান টিরেন- দুটো কনভার্জিং ট্র্যাকে ছুটে আসছে- ছবিতে লেখা 'লাইক করে লিখুন স্টপ, আর দেখুন কী হয়'। হা আল্লে্হশ্বর, হা বুদ্ধৃষ্ট, সেই ছবিতে সাড়ে তিন লাখ লাইক আর পৌনে চার লাখ 'স্টপ' লেখা কমেন্ট!
ঠিক এই জায়গায় এসে আমি নিজের ওপর প্রবলভাবে বিশ্বাস হারাতে শুরু করলাম। ভীষণ সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করলাম নিজেকে। দিন গেল। জানতে পারলাম আমার ঘরের দেওয়ালে দেশের যে মানচিত্র ঝোলে সেটা মোটেও ঠিক মানচিত্র নয়। ফুল ঘাপলা। বুঝতে পারলাম নেতা যখন বলছে 'আমি এই করেছি, এই করি' তখন সেটা পুরোটাই গুল-মার্গ কেস। অথচ, আমি ভাবতে থাকি একটা লোক লক্ষটা লোকের সামনে চোখমুখ স্বাভাবিক রেখে চিৎকার করে একটা মিথ্যে বলছে, কীভাবে? না না, হতেই পারে না। আমি দ্বিগুন অবিশ্বাসী হয়ে যাই নিজের ওপর।
তারপর দেখি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ইজুক্যালটু বিলিয়ন ডলার ঘাপলা, সাদ্দাম হত্যা ইজুক্যালটু অন্য কেস, এমনকি মিশন জেরোনিমোও নাকি ঘাপলা। আগেই শুনেছিলাম, দিন কয়েক আগে অ্যাসাঞ্জ বললেন, আরে লাদেনবাবু দিব্য বেঁচে রয়েছেন তো! তবে যে! অ্যাওয়ার্ড উইনিং সিনেমা- ফিনেমা হয়ে গেল! হা আল্লে্হশ্বর!
আমি মাইরি সেই 'সবাইকে বিশ্বাস করি, সবই খাঁটি' থেকে 'কাউকেই বিশ্বাস করি না, সবই সন্দেহজনক'এ ল্যান্ড করেছি। মাঝে তো এই 'সবই সাজানো' থিয়োরি দ্বারাও প্রবলভাবে নাড়া খেয়েছিলাম। দিদি যে আমার এই বিশ্বাসহীনতার জার্নির অনেক আগেই এ পথে হেঁটেছেন ও ধর্নামঞ্চ বেঁধে রীতিমতো অনশন করে এই 'সবই চক্রান্ত' উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন তা আমায় গভীরে নাড়া দেয়। ফলে, আমি জানি, আজ যে বেগুন কিনব হাসিমুখে কাল তাতে পোকা বেরোবেই। আজ যার আগুন দেখব বাসিমুখে কাল সে বোকা বেরোবেই। আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, রাস্তায় সমস্ত নেড়িরই জলাতঙ্ক আছে এবং সবাই আমার দাবনায় দাঁত বসাবার গুপ্ত ইচ্ছা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু বেঁচেবর্তে থাকতে হবে তো! ফলে নেড়ি দেখলেই ঢিল নিয়ে তেড়ে যাওয়া যায় না। পাবলিক দায়িত্ব নিয়ে রাঁচি দিয়ে আসবে। ফলে লাভের লাভ, তুমুল সাবধান হয়ে গেছি। পকেটে ঢিল নিয়ে ঘুরি অলটাইম। এই অ্যাকুয়ার্ড সন্দেহটার আরেকটা হেব্বি দিক আছে। ছবি হাফ পেরোতে না পেরোতেই শাটার আইল্যান্ড বুঝে যাই, মেমেন্টোও জলবৎ তরলং।
মুশকিল হয় যখন একটা ঘটনা ঘটে আর তাতে সবাই আলোড়িত হয়ে যায়। আমি আর আলোড়িত হতেই পারিনা। ঘটনার রঙ্গমঞ্চে তাকিয়ে যেই আবেগতাড়িত হতে যাব অমনি নিওকর্টেক্স থেকে আওয়াজ আসে, সামলে বাপু সামলে। একটু থাম। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার মাথায় এক বালতি বরফ ঢাললে আমার প্রথমে রিয়্যাকশান হবে, ইহা কি সত্যিই বরফ? কে ঢালিল? সে কি সত্যিই বরফ ঢালিয়াছে? তার পনের মিনিট পর আমি হিহি কাঁপব। খুব জটিল পরিস্থিতি সন্দেহ নেই, কিন্তু নিজের উদাহরণ দিয়ে বোঝালাম বলে হাফ-সিরিয়াস হয়ে ব্যাপারটা নেবেন না প্লিজ। আর তাছাড়া, নিজেকে দিয়ে না বলে আর উপায় কি? সবাই অফেন্ডেড হয়, সব্বার গায়ে লাগে। বুঝিই না বাপু কী নিয়ে কথা বলব? অন্তত সন্দেহের কথাও আর কি।
ফলে, বিশ্বাস করে ফেলেছি, সন্দেহই মূল ব্যাপার। সব্বার নিজস্ব হিডেন অ্যাজেন্ডা ভাই। যে যা বলছে, সে আসলে তা বলছে না। আমি যা দেখছি, আসলে সে জিনিস ঘটছে না। কিন্তু এগেন, এভাবে টানা যাচ্ছে না, যায় না।
ফলে একশ বছর পেরিয়ে যখন গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ এর উপস্থিতি প্রমাণিত হয় তখন আমি প্রবল উত্তেজিত হয়ে পড়ি। যদি চর্চা করতে হয় ভাই বিজ্ঞানচর্চা করব। অ্যাপ্লায়েড না, পিওর।
বা সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্র- এসব। ঘুরতে টুরতে যাব। নদীর জল ছুঁয়ে দেখব, পাহাড়ে চড়ব নিজে। গোদাবরী আর পশ্চিমঘাট যে আদৌ আছে, সে জিনিস বিশ্বাস করাও চাপ হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
পৃথিবীকে তো আর নেড়িশূন্য করা যাবে না, ফলে শিশুর বাসযোগ্য করতে হলে শিশুর নিওকর্টেক্সে বাস করা পৃথিবীটাকেই নেড়েচেড়ে দেখতে হবে। নিন্দুক বলিল, আপনার এই সিদ্ধান্তকেও সন্দেহের চোখে দেখার কোনও কারণ নেই বলছেন? সম্পূর্ণ নিজস্ব জিনিস? অ্যাজেন্ডা রহিত?
তবে রে! পকেট থেকে ঢিল বের করি। জোরে জোরে মন্ত্র আওড়াই, Cogito ergo sum, cogito ergo sum... খবরে দেখতে পাই, দেশবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে নাকি দেশাত্মবোধক এক ব্যক্তি, সির্ফ অন্যের মুখে কালি লেপার জন্য। হা আল্লে্হশ্বর!
সুত্র ঃ অনিক চক্রবর্তী, গ্লোমি সানডে।