Saturday, 12 September 2015

এইডস নিয়ে কিছু কথা

এইডস কী?

প্রথমেই এটা জেনে রাখা প্রয়োজন যে এইডস কোন রোগ নয়। AIDS এর পূর্ণরূপ হলো Acquired Immune Deficiency Syndrome, এটার বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায়- ‘অর্জিত বা অন্যের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির লক্ষণসমূহ’। আর HIV মানে হচ্ছে Human Immunodeficiency Virus। এইচআইভি এমন একধরনের ভাইরাস, যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এইচআইভি সংক্রমণের কারণে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন অতিরিক্ত হ্রাস পায় তখন যে কোন সহজ রোগও (যেমন: নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, ডায়রিয়া ইত্যাদি) যথাযথ চিকিৎসায় নিরাময় হয় না। শরীরের এই অবস্থার নাম হলো এইডস।

কোন কোন তরলে এইচআইভি থাকে?

মানবদেহের প্রায় ৪ টি তরল পদার্থে এইচআইভি থাকে। যথা-
  • রক্ত,
  • বীর্য,
  • সেক্সুয়াল ফ্লুইড/ভ্যাজাইনাল ফ্লুইড,
  • মায়ের বুকের দুধ।
একটা মজার ব্যপার হচ্ছে, এই চারটা তরল ছাড়াও মুখের লালা এবং প্রস্রাবেও এইচআইভি থাকে। তবে সেগুলো এইচআইভি সংক্রমণের জন্য যথেষ্ট নয়। হ্যাঁ, Lip kiss এর মাধ্যমে এইচআইভি হতে পারে, তবে শর্ত হচ্ছে একজনের মুখ থেকে আরেকজনের মুখে কমপক্ষে ৩-৪ লিটার লালা স্থানান্তর করতে হবে।

এইডস কিভাবে ছড়ায়

  • এইচআইভি আক্রান্ত কোন নারী বা পুরুষের সাথে অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করলে। বিশ্বব্যাপী শতকরা আশি ভাগ এইচআইভি সংক্রমণের কারণ কিন্তু এই ‘অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক’।
  • এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুচ, সিরিঞ্জ অপরিশোধিত অবস্থায় ব্যবহার করলে। এছাড়াও আক্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন অঙ্গ (যেমন- কর্নিয়া, হৃৎপিণ্ড, কিডনী ইত্যাদি) কোন সুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করলে।
  • এইচআইভি সংক্রমিত মায়ের মাধ্যমে সন্তান এইচআইভিতে আক্রান্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার তিনটি পর্যায় রয়েছে। এই তিনটির যেকোন সময়েই সন্তান আক্রান্ত হতে পারে। যথা- গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময় ও বুকের দুধ পান করানোর মাধ্যমে।

এইচআইভি কোন কোন উপায়ে ছড়ায় না

  • এটি কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। বায়ু, পানি, খাদ্য, কিংবা সাধারণ স্পর্শে এইচআইভি ছড়ায় না।
  • আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে একই প্লেটে খাবার খেলে এইডস হয় না।
  • আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা করলে এইডস ছড়ায় না।
  • একই বিছানা ব্যবহার করলেও এইডসে আক্রান্ত হওয়ার কোন ঝুঁকি থাকে না।
  • আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি থেকে, কিংবা একই পুকুরে গোসল করলেও এইডস ছড়ায় না।
  • মশা কিংবা অন্য কোনো পোকা-মাকড়ের মাধ্যমেও এইডস ছড়ায় না।

এইডসের লক্ষণসমূহ

প্রকৃতপক্ষে এইডসের কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষণ নেই। দেশ ও স্থানভেদে এইডসের লক্ষণের পার্থক্য দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এইডসের কিছু সাধারণ লক্ষণ-
  • অজানা কারণে দু’মাসের অধিক সময় ধরে পুনঃ পুনঃ জ্বর হওয়া বা রাতে শরীরে অধিক ঘাম হওয়া।
  • অতিরিক্ত অবসাদ অনুভব হওয়া।
  • শরীরের ওজন দ্রুত হ্রাস পাওয়া।

এইচআইভি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণাসমূহ

এইচআইভি নিয়ে অনেকেই ভ্রান্ত ধারণা মনে পোষণ করে থাকেন। অথচ এগুলো আদৌ সঠিক নয়। যেমন-
  • দৈহিক মিলনের পর যৌনাঙ্গ ভালো করে পরিষ্কার করলে এইডস হয় না।
  • দৈহিক মিলনের সময় লুব্রিকেট ব্যবহার করলে এইডস হয় না।
  • এন্টিবায়োটিক সেবন করে এইডস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
  • টিকা ব্যবহার করলে এইডসের ঝুঁকি থাকে না।
  • আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি থেকে এইডস ছড়ায়।
  • এইডস শুধুমাত্র যৌনকর্মী, বহুগামী কিংবা সমকামীদের মাধ্যমে ছড়ায়।
  • চুমুর মাধ্যমে এইডস ছড়ায়।
প্রকৃতপক্ষে এইগুলো সবগুলোই ভুল ধারণা। এগুলো একটাও সত্যি নয়।

যৌনরোগ ও এইচআইভি সংক্রমণ

যৌনরোগ কী

যে সমস্ত রোগ প্রধানত দৈহিক মিলনের মাধমে বিস্তার লাভ করে সেগুলোকেই যৌনরোগ বলে। যেমন- গনোরিয়া, সিফিলিস, ক্ল্যামিডিয়া ইত্যাদি। তবে দৈহিক মিলন ছাড়াও যৌনরোগ সংক্রমিত হতে পারে। যেমন- অপরিশোধিত রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে। ইংরেজীতে Sexually Transmitted Disease (STD) এবং Sexually Transmitted Infection (STI) এর মানেই হলো যৌনরোগ।

যৌনরোগের লক্ষণসমূহ

যৌনরোগের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ রয়েছে। এগুলোর যেকোন একটি লক্ষণ দেখা দিলেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের সরণাপন্ন হওয়া উচিত।
  • যৌনাঙ্গ কিংবা এর আশেপাশে ঘা হলে।
  • যৌনাঙ্গ থেকে পুঁজ বের হওয়া।
  • প্রস্রাবের সময় ব্যথা ও জ্বালা করা।
  • দৈহিক মিলনের সময় যৌনাঙ্গে ব্যথা অনুভব হওয়া।
  • যৌনাঙ্গে খুব বেশি চুলকানি হওয়া।
  • মহিলাদের পানির মতো স্রাব হওয়া।
সময়মতো যৌনরোগের সঠিক চিকিৎসা না করালে নানাবিধ স্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন- রোগী বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে, মায়ের পেটে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যেতে পারে, শিশু অন্ধ/বিকলাঙ্গ/পঙ্গু হয়ে জন্মাতে পারে, জরায়ুমুখ ক্যান্সার হতে পারে, এইচআইভি এবং হেপাটাইটিস ভাইরাস সহজেই আক্রমণ করতে পারে।

যৌনরোগের সাথে এইচআইভি’র সম্পর্ক

যৌনরোগের সাথে এইচআইভি’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যেমন- যারা যে কোন ধরনের যৌনরোগে ভুগছেন তাঁদের এইচআইভিতে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চাইতে ৫-১০ শতাংশ বেশি। যৌনরোগের চিকিৎসা আছে, সঠিক চিকিৎসায় যৌনরোগ ভালো হয়। কিন্তু এইচআইভির কোন চিকিৎসা নেই। একবার এইচআইভিতে আক্রান্ত হলে মৃত্যু অনিবার্য।

কাদের এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি

অসচেতনতার কারণে যেকেউই এইচআইভিতে আক্রান্ত হতে পারে। তবে কিছু গোষ্ঠীর এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যাধিক বেশি। এরা হলো,
  • ইনজেকশানের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী
  • মহিলা ও পুরুষ যৌনকর্মী এবং তাদের খদ্দের
  • পেশাদার রক্ত বিক্রেতা
  • হিজড়া
  • সমকামী
  • অল্পবয়সী জনগোষ্ঠী
  • পরিবহন শ্রমিক ইত্যাদি
এরা কেন ঝুঁকিপূর্ণ সেটা সবার বোধগম্য হয়েছে আশা করি। তবে শেষের দুটো গোষ্ঠী (অল্পবয়সী জনগোষ্ঠী, পরিবহন শ্রমিক) কেন ঝুঁকিপুর্ণ এটা অনেকের বোধগম্য নাও হতে পারে। তাই ব্যাখ্যা করে দিচ্ছি।
অল্পবয়সী জনগোষ্ঠী: UNAIDS(২০১০) এর তথ্যানুযায়ী বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর নতুনভাবে যারা এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছে তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ২৫ বছর বয়সের কম বয়সী কিশোর-কিশোরী এবং যুবক-যুবতী। কেননা অল্পবয়সে এরা যৌনরোগের কথা শুনে থাকলেও এ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য কোন পদক্ষেপ নেয় না। কিশোর-কিশোরীরা মনে করে না যে তারা এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ICDDRB ও SC-USA এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিবাহপূর্ব যৌন অভিজ্ঞতা লাভ করেছে ১৫-১৭ বছর বয়সী ১১% কিশোর এবং ২% কিশোরী। ১৮-২০ বছর বয়সী ২৩% যুবক ও ২% যুবতী। ২১-২৪ বছর বয়সের ৩৫% যুবক ও ২% যুবতী।
আর অল্পবয়সী মেয়েরাও এইচআইভি ঝুঁকিতে বেশি থাকে। কারণ তারা অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের সময় বাধা দিতে পারে না। ওরা পুরুষকে প্রতিরোধ করতে পারে না। এছাড়াও মেয়েদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য এইচআইভিতে সংক্রমিত হওয়ার জন্য ছেলেদের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি।
পরিবহন শ্রমিক: বিভিন্ন পতিতালয়ের যারা নিয়মিত খদ্দের তাদের অর্ধেকের বেশি হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণীর পরিবহন শ্রমিক। তাই তারা এইচআইভিতে বেশি আক্রান্ত হয়।

এইচআইভি প্রতিরোধে করণীয়

আমাদের দেশে ও আমাদের পাশের দেশ ভারতে প্রায় একই সময়ে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিলো। অথচ বর্তমান পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ভারতে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। এই ধারা অব্যাহত রাখতে এবং বাংলাদশকে এইচআইভিমুক্ত করতে কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-
  • যৌনসঙ্গী নির্বাচনে সতর্ক হওয়া; এবং মিলনের আগে STD এর ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নেয়া।
  • যৌনমিলনের সময় কনডম ব্যবহার করা।
  • কোন কারণে রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন হলে রক্তদাতার রক্তে এইচআইভি আছে কি না- তা অবশ্যই পরীক্ষা করে নেওয়া।
  • প্রতিবারই ইনজেকশানের নতুন সূঁচ ও সিরিঞ্জ ব্যবহার করা; এবং অস্ত্রোপচারের যাবতীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই জীবাণুমুক্ত করে নেওয়া।
  • কেউ যৌনরোগে আক্রান্ত হলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।

এইচআইভি’র চিকিৎসা

মনে রাখতে হবে, এইডসে আক্রান্ত হলে মৃত্যু অনিবার্য। এর কোনো সঠিক চিকিৎসা নেই। তবে কিছু ঔষধ আছে যা ARV (Anti Retroviral Drug) নামে পরিচিত, এগুলো এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে ভালো থাকতে সাহায্য করে।

No comments:

Post a Comment